তকাল খুলনা নগরীর টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড এলাকায় নির্যাতন চালিয়ে শিশু রকিবকে হত্যা করেছে গ্যারেজ মালিক মিন্টু মিয়া।
দেশে দিন দিন বাড়ছে বর্বরতা। নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে চলতি বছর প্রাণ দিতে হয়েছে সিলেটের রাজন, খিলক্ষেতের নাজিম আর খুলনার রাকিবকে। অমানুসিক নির্যাতন সইতে না পেরে মৃত্যুর আগ মুহুর্তে এসব শিশুর করুন আর্তনাদ আর আকুতি-অনুনয়ও খুনিদের পাষান হৃদয়ে এক বিন্দু মায়া সৃষ্টি করতে পারেনি। ওইসব হিংস্র মানুষরূপি দানবদের হাত থেকে রেহাই মিলেনি রাজন, নাজিম আর রাকিবের। আর চোর সন্দেহে শিশুদের উপর নির্যাতন এখন নিত্য নৈমেত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সিলেটের রাজন হত্যাকান্ড নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়ের মধ্যেই খুলনায় নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে মোঃ রাকিব নামের ১২ বছরের এক শিশুকে। নগরীর টুটপাড়া এলাকায় একটি মোটর গ্যারেজে গত সোমবার রাতে রাকিবকে উলঙ্গ করে বেদম পেটানোর পর রিকশা-গাড়ির চাকায় হাওয়া দেওয়া মেশিনের পাইপ তার মলদ্বারে ঢুকিয়ে হাওয়া দেওয়া হয়। এতে শিশুটির শরীর ফুলে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর জনতা গ্যারেজ মালিক মিন্টু মিয়া (৪০), কর্মচারী শরীফ (৩৫) এবং শরীফের মা বিউটি বেগমকে (৫৫) আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। এ বিষয়ে রাকিবের বাবা তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে খুলনাসহ গোটা দেশ।
'মামা আর দিয়েন না, আমি মরে যাব' : মৃত্যু যন্ত্রণায় রাকিব ছটফট করলেও তা নির্যাতনকারীদের পাষান হৃদয় স্পর্শ করেনি বলে জানিয়েছে এই শিশুর এক বন্ধু, যে চিৎকার শুনে সেখানে গিয়েছিল। রাকিবের চিৎকার শুনে সোমবার রাতে খুলনা নগরীর টুটপাড়া কবরস্থানের কাছে মিন্টু মিয়ার মোটর গ্যারেজে গিয়েছিল ওই শিশুটি। সে জানায়, 'মেশিন দিয়ে যখন রাকিবের পেটের ভিতরে বাতাস ঢুকাচ্ছিল, তখন রাকিব শুধু বলছিল- 'মামা আর দিয়েন না, আমি মরে যাব'। খান জাহান আলী সড়কের ওই গ্যারেজে এক সময় কাজ করত ১২ বছরের রাকিব। মালিক মিন্টু মিয়াকে ডাকত মামা। কিন্তু নির্যাতন চালানো হত বলে সেই কাজ ছেড়ে পিটিআই মোড়ে অন্য একটি গ্যারেজে কাজ নেয় সে। এ কারণে মিন্টু মিয়া ক্ষুব্ধ হয় এবং রাকিবের উপর নির্মম নির্যাতন চলে বলে রাকিবের পরিবারের অভিযোগ। আর এই নির্যাতনই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় শিশুটিকে। নির্যাতনের পর রাকিবকে প্রথমে নেওয়া হয় কাছের স্থানীয় একটি ক্লিনিকে, সেখান থেকে পাঠানো হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকায় নিতে অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।
রাকিবের মৃত্যু যন্ত্রণা ভুলতে পারছেন না মা : হাসপাতালেও রাকিবের মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফটের কথা ভুলতে পারছেন না তার মা লাকি বেগম। 'রাকিব আমাকে বলে, মা আমি আর বাঁচব না, যন্ত্রণায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ও মা আমাকে তুমি বাঁচাও মা।' টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের বাসায় সন্তান হারানো লাকির এই আর্তনাদ ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে। চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে প্রতিবেশীদের অনেকেই বেরিয়ে আসেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে চিকিৎসক রাকিবকে দেখেছেন, সেই সুমন রায় বলেন, 'শিশুটির শরীরে অস্বাভাবিক পরিমাণ বাতাস প্রবেশ করানোয় তার পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি ছিড়ে গিয়েছিল, ফুসফুসও ফেটে যায়।' পুলিশ জানায়, সাতক্ষীরার দিনমজুর নূর আলম হাওলাদারের ছেলে রাকিব। বছর তিনেক আগে খুলনায় এসে টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের বস্তিতে উঠেন নূর আলম। অভাবের কারণে দেড় বছর আগে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলে রাকিবকে মিন্টু মিয়ার গ্যারেজে কাজে দিয়েছিলেন নূর আলম। লাকি বলেন, 'গ্যারেজ মালিকের গালমন্দ ও কথায় কথায় মারপিটের কারণে কাজ ছেড়ে পিটিআই মোড়ে নাসিরের গ্যারেজে কাজ নেয় রাকিব। এতেই ক্ষুব্ধ হয় মিন্টু মিয়া।' সে জন্য একটি শিশুকে মেরে ফেলা হবে- এই বিস্ময় এলাকাবাসীর। 'কী অপরাধ করেছিল আমার বুকের ধন'- সবার কাছে লাকি এই প্রশ্নের চাইলেও উপস্থিত সবাই ছিল নির্বাক। খুলনা সদর থানার ওসি সুকুমার বিশ্বাস জানান, নিহত রাকিবের বাবা নুরুল আলম গতকাল মঙ্গলবার সকালে এই হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কত ভারী : পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কত ভারী, এটি ফের খুলনায় মধ্যযুগীয় নির্যাতনে নিহত একমাত্র পুত্রহারা রাকিবের পিতা দিনমজুর নূর আলম হাওলাদারের দিকে তাকিয়ে অনুভব করেছেন অনেকেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সন্তানের লাশ কাঁধে টুটপাড়া কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় হয়তো তিনি বুঝেছেন তার ভার কতটা! মানুষ হয়তো হিমালয় পর্বত কাঁধে করে বহন করতে পারে, কিন্তু সন্তানের লাশ বহন করতে পারে না। যখন কোনো পিতা পুত্রের দেহ কাঁধে নেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন, তখন বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না সে লাশ কত ভারী! যেমনটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে বার বার বিলাপ করছিলেন শিশু রাকিবের পিতা নূর আলম। এ সময় তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা যারা এসেছেন এ গরীবের পক্ষ থেকে একটাই দাবি, আমার কলিজার টুকরা হত্যার সঠিক বিচার যেনো পাই। শরীফ, মিন্টু আর তার সহযোগীদের যেন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ওঠেন, আর যেন কোনো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ না নিতে হয়!
নিন্দার ভাষা নেই, ফুঁসছে খুলনা: শিশু রাকিব হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন এলাকাবাসী। ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে দলমত নির্বিশেষে মানুষ আসছেন রাকিবের বাড়িতে। সরেজমিন মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, রাকিবের বাড়িতে সমব্যথী মানুষের ভিড়। মানুষের চাপে টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আসামিদের ফাঁসি দাবিতে ব্যানার আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকা। নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক মহেন সেন বলেন, 'পৈশাচিক নির্যাতনে শিশু রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আজ বুধবার বেলা ১১টায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে।' সকালে রাকিব হত্যার খবর পেয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক খুলনা-২ আসনের এমপি মিজানুর রহমান মিজান, সাবেক সংসদ সদস্য মহানগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি, বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ রাকিবদের বাড়িতে আসেন। সমবেদনা প্রকাশ করে তারা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন। খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবু সুকুমার বিশ্বাস জানান, এজাহারভুক্ত আসামি তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আলামতস্বরূপ হাওয়া মেশিন পাইপসহ জব্দ করা হয়েছে। দ্রুতই মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে। সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিজান বলেন, 'এ হত্যাকা ের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটিই আমাদের চাওয়া।'
রাজন হত্যার দৃশ্য এখনও কাঁদায় : গত ৮ জুলাই সকালে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চোর 'অপবাদে' এক সামিউল আলম রাজন (১৩) নামের শিশুকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় তোলপাড়। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে নির্যাতনের সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন নির্যাতনকারীদেরই একজন, যা ওই ভিডিওর কথোপকথনে স্পষ্ট। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গেফতার করেছে। নিহত রাজন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে। স্থানীয় অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শেনি পর্যন্ত পড়ালেখা করা রাজন সবজি বিক্রি করত। কুমারগাঁও এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে ভ্যান চুরির অভিযোগে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একটি মাইক্রোবাসে তুলে রাজনের লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় মুহিত আলম (২২) নামের একজনকে ধরে পুলিশে দেন স্থানীয়রা। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ২৮ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, রাজনকে কুমারগাঁও বাসস্টেশনের একটি দোকানঘরের বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। এতে দুজনের চেহারা দেখা গেলেও কণ্ঠ শোনা গেছে তিন-চারজনের। 'এই ক (বল) তুই চোর, তোর নাম ক... লগে কারা আছিল...' এসব বলতে বলতে রাজনকে পেটাতে দেখা যায় ওই ভিডিওতে। একনাগাড়ে ১৬ মিনিট তাকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এক পর্যায়ে পানি খেতে চাইলে 'ঘাম খা' বলে মাটিতে ফেলে রাখা হয় তাকে। মারধরের সময় রাজনের আর্তচিৎকার এবং নির্যাতনকারীদের অট্টহাসি ও নানা কটূক্তি শোনা যায়। রাজনের নখ, মাথা ও পেটে রোল দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতেও দেখা যায়। এক সময় তার হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটিয়ে নিতে দেখা যায় নির্যাতনকারীদের। বলতে শোনা যায়- 'হাড়গোড় তো দেখি সব ঠিক আছে, আরও মারো...।' এরপর খুঁটির সঙ্গে বেঁধে আরেক দফা পেটানো হয় রাজনকে। সে তাকে পুলিশে দিতে অনুরোধ করলে একজনকে বলতে শোনা যায়, 'আমি পুলিশ।' যিনি ওই ভিডিও ধারণ করছিলেন, তাকে নির্দেশ করে একটি কণ্ঠ জানতে চায়- ঠিকমতো ভিডিও হচ্ছে কি-না। ওপাশ থেকে উত্তর আসে- 'ফেইসবুকে ছাড়ি দিছি, অখন সারা দুনিয়ার মানুষ দেখব...।' শেষ দিকে নির্যাতনকারীদের একজন সঙ্গীদের কাছে জানতে চায়- 'কিতা করতাম?' আরেকজনকে তখন বলতে শোনা যায়- 'মামায় যে কইছন, ওই কাম করি ছাড়ি দে!'
খিলক্ষেতে যেভাবে হত্যা করা হয় নাজিমকে : রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার মস্তুল গামে এপ্রিল মাসে শিশু নাজিমকে নির্মমভাবে হত্যার পর লাশ নদীতৈ ভাসিয়ে দেওয়া হলেও রাজন হত্যার তোলপাড়ের মধ্যেই নাজিম হত্যার ভিডিওচিত্র মেলে ফেইসবুকে। চুরির অপবাদে নাজিমউদ্দিন নামে ১৪ ওই শিশুটিকে পিটিয়ে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় পানিতে। শিশুটি নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে খুনিরা। চাঞ্চল্যকর ওই মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তদন্ত করছে।
নিহত শিশু নাজিমউদ্দিনের বাবা সালাম মিয়া বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় থাকেন। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল এক বন্ধুর সঙ্গে বাইরে যাওয়ার পর আর ছেলের খোঁজ পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে ১৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নদীতে নাজিমউদ্দিনের লাশ পাওয়া যায়। খিলক্ষেত থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল কথিত কবুতর চুরির অপরাধে নাজিমউদ্দিনেক আটক করে অমানুষিক নির্যাতন চালায় খিলক্ষেতের মস্তুল গ্রামের ৮ থেকে ১০ জন যুবক। এরপর হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় বালু নদীতে। তিনদিন পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নাজিমউদ্দিনের লাশ ভেসে ওঠে। ১৮ এপ্রিল সাতজনের নাম উল্লেখ করে তার বাবা খিলক্ষেত থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ ওই ঘটনায় এজাহারনামীয় প্রধান আসামিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। ওই সময় তারা মোবাইলে ধারণকৃত হত্যার ছবি উদ্ধার করে। তবে নিহত শিশুটির বাবা জানান, তার ছেলে ষড়যন্ত্রের শিকার। সে চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে না। ফেসবুকে আপলোড করা ছবিতে দেখা গেছে, নির্যাতনের এক পর্যায়ে শিশুটি যখন মৃতপ্রায় তখন সে পানি খেতে চায়। এরই এক পর্যায়ে শিশুটিকে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় নদীর পানিতে। হাত-পা বাঁধা শিশুটি নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে খুনীরা।
ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ : এদিকে মধ্যযুগীয় নির্যাতনে নিহত শিশু রাকিব হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে খুলনাবাসী। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নগরীর ব্যস্ততম খানজাহান আলী রোড ও সেন্ট্রাল রোডে দফায় দফায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ খুলনাবাসী। এ সময় এ দুই সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। রাকিব হত্যায় অভিযুক্ত নগরীর টুটপাড়ার শরীফ মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টুর ফাঁসি দাবি করা হয় মিছিল ও বিক্ষোভ থেকে। বিক্ষোভ মিছিলে শিশু রাকিবের একমাত্র বোন রিমি (৮) ও খালা পারুল বেগমসহ সর্বস্তরের নারী, পুরুষ ও শিশুরা অংশ নেয়। সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি নির্যাতনে নিহত রাকিবের বাড়িতে এসে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়ে বলেন, এ ঘটনায় ৩ সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
দেশে দিন দিন বাড়ছে বর্বরতা। নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে চলতি বছর প্রাণ দিতে হয়েছে সিলেটের রাজন, খিলক্ষেতের নাজিম আর খুলনার রাকিবকে। অমানুসিক নির্যাতন সইতে না পেরে মৃত্যুর আগ মুহুর্তে এসব শিশুর করুন আর্তনাদ আর আকুতি-অনুনয়ও খুনিদের পাষান হৃদয়ে এক বিন্দু মায়া সৃষ্টি করতে পারেনি। ওইসব হিংস্র মানুষরূপি দানবদের হাত থেকে রেহাই মিলেনি রাজন, নাজিম আর রাকিবের। আর চোর সন্দেহে শিশুদের উপর নির্যাতন এখন নিত্য নৈমেত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে সিলেটের রাজন হত্যাকান্ড নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়ের মধ্যেই খুলনায় নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে মোঃ রাকিব নামের ১২ বছরের এক শিশুকে। নগরীর টুটপাড়া এলাকায় একটি মোটর গ্যারেজে গত সোমবার রাতে রাকিবকে উলঙ্গ করে বেদম পেটানোর পর রিকশা-গাড়ির চাকায় হাওয়া দেওয়া মেশিনের পাইপ তার মলদ্বারে ঢুকিয়ে হাওয়া দেওয়া হয়। এতে শিশুটির শরীর ফুলে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনার পর জনতা গ্যারেজ মালিক মিন্টু মিয়া (৪০), কর্মচারী শরীফ (৩৫) এবং শরীফের মা বিউটি বেগমকে (৫৫) আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। এ বিষয়ে রাকিবের বাবা তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে খুলনাসহ গোটা দেশ।
'মামা আর দিয়েন না, আমি মরে যাব' : মৃত্যু যন্ত্রণায় রাকিব ছটফট করলেও তা নির্যাতনকারীদের পাষান হৃদয় স্পর্শ করেনি বলে জানিয়েছে এই শিশুর এক বন্ধু, যে চিৎকার শুনে সেখানে গিয়েছিল। রাকিবের চিৎকার শুনে সোমবার রাতে খুলনা নগরীর টুটপাড়া কবরস্থানের কাছে মিন্টু মিয়ার মোটর গ্যারেজে গিয়েছিল ওই শিশুটি। সে জানায়, 'মেশিন দিয়ে যখন রাকিবের পেটের ভিতরে বাতাস ঢুকাচ্ছিল, তখন রাকিব শুধু বলছিল- 'মামা আর দিয়েন না, আমি মরে যাব'। খান জাহান আলী সড়কের ওই গ্যারেজে এক সময় কাজ করত ১২ বছরের রাকিব। মালিক মিন্টু মিয়াকে ডাকত মামা। কিন্তু নির্যাতন চালানো হত বলে সেই কাজ ছেড়ে পিটিআই মোড়ে অন্য একটি গ্যারেজে কাজ নেয় সে। এ কারণে মিন্টু মিয়া ক্ষুব্ধ হয় এবং রাকিবের উপর নির্মম নির্যাতন চলে বলে রাকিবের পরিবারের অভিযোগ। আর এই নির্যাতনই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় শিশুটিকে। নির্যাতনের পর রাকিবকে প্রথমে নেওয়া হয় কাছের স্থানীয় একটি ক্লিনিকে, সেখান থেকে পাঠানো হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে ঢাকায় নিতে অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।
রাকিবের মৃত্যু যন্ত্রণা ভুলতে পারছেন না মা : হাসপাতালেও রাকিবের মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফটের কথা ভুলতে পারছেন না তার মা লাকি বেগম। 'রাকিব আমাকে বলে, মা আমি আর বাঁচব না, যন্ত্রণায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। ও মা আমাকে তুমি বাঁচাও মা।' টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের বাসায় সন্তান হারানো লাকির এই আর্তনাদ ছুঁয়ে যায় উপস্থিত সবাইকে। চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে প্রতিবেশীদের অনেকেই বেরিয়ে আসেন। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে চিকিৎসক রাকিবকে দেখেছেন, সেই সুমন রায় বলেন, 'শিশুটির শরীরে অস্বাভাবিক পরিমাণ বাতাস প্রবেশ করানোয় তার পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি ছিড়ে গিয়েছিল, ফুসফুসও ফেটে যায়।' পুলিশ জানায়, সাতক্ষীরার দিনমজুর নূর আলম হাওলাদারের ছেলে রাকিব। বছর তিনেক আগে খুলনায় এসে টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোডের বস্তিতে উঠেন নূর আলম। অভাবের কারণে দেড় বছর আগে চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ুয়া একমাত্র ছেলে রাকিবকে মিন্টু মিয়ার গ্যারেজে কাজে দিয়েছিলেন নূর আলম। লাকি বলেন, 'গ্যারেজ মালিকের গালমন্দ ও কথায় কথায় মারপিটের কারণে কাজ ছেড়ে পিটিআই মোড়ে নাসিরের গ্যারেজে কাজ নেয় রাকিব। এতেই ক্ষুব্ধ হয় মিন্টু মিয়া।' সে জন্য একটি শিশুকে মেরে ফেলা হবে- এই বিস্ময় এলাকাবাসীর। 'কী অপরাধ করেছিল আমার বুকের ধন'- সবার কাছে লাকি এই প্রশ্নের চাইলেও উপস্থিত সবাই ছিল নির্বাক। খুলনা সদর থানার ওসি সুকুমার বিশ্বাস জানান, নিহত রাকিবের বাবা নুরুল আলম গতকাল মঙ্গলবার সকালে এই হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কত ভারী : পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ কত ভারী, এটি ফের খুলনায় মধ্যযুগীয় নির্যাতনে নিহত একমাত্র পুত্রহারা রাকিবের পিতা দিনমজুর নূর আলম হাওলাদারের দিকে তাকিয়ে অনুভব করেছেন অনেকেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সন্তানের লাশ কাঁধে টুটপাড়া কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার সময় হয়তো তিনি বুঝেছেন তার ভার কতটা! মানুষ হয়তো হিমালয় পর্বত কাঁধে করে বহন করতে পারে, কিন্তু সন্তানের লাশ বহন করতে পারে না। যখন কোনো পিতা পুত্রের দেহ কাঁধে নেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন, তখন বুঝতে কোনো অসুবিধা হয় না সে লাশ কত ভারী! যেমনটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে বার বার বিলাপ করছিলেন শিশু রাকিবের পিতা নূর আলম। এ সময় তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা যারা এসেছেন এ গরীবের পক্ষ থেকে একটাই দাবি, আমার কলিজার টুকরা হত্যার সঠিক বিচার যেনো পাই। শরীফ, মিন্টু আর তার সহযোগীদের যেন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা হয়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে ওঠেন, আর যেন কোনো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ না নিতে হয়!
নিন্দার ভাষা নেই, ফুঁসছে খুলনা: শিশু রাকিব হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন এলাকাবাসী। ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে দলমত নির্বিশেষে মানুষ আসছেন রাকিবের বাড়িতে। সরেজমিন মঙ্গলবার গিয়ে দেখা যায়, রাকিবের বাড়িতে সমব্যথী মানুষের ভিড়। মানুষের চাপে টুটপাড়া সেন্ট্রাল রোড় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আসামিদের ফাঁসি দাবিতে ব্যানার আর পোস্টারে ছেয়ে গেছে এলাকা। নাগরিক সমাজের সাধারণ সম্পাদক মহেন সেন বলেন, 'পৈশাচিক নির্যাতনে শিশু রাকিবকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে আজ বুধবার বেলা ১১টায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হবে।' সকালে রাকিব হত্যার খবর পেয়ে মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক খুলনা-২ আসনের এমপি মিজানুর রহমান মিজান, সাবেক সংসদ সদস্য মহানগর বিএনপি সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি, বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ রাকিবদের বাড়িতে আসেন। সমবেদনা প্রকাশ করে তারা এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছেন। খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবু সুকুমার বিশ্বাস জানান, এজাহারভুক্ত আসামি তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আলামতস্বরূপ হাওয়া মেশিন পাইপসহ জব্দ করা হয়েছে। দ্রুতই মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে। সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিজান বলেন, 'এ হত্যাকা ের নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক এটিই আমাদের চাওয়া।'
রাজন হত্যার দৃশ্য এখনও কাঁদায় : গত ৮ জুলাই সকালে সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চোর 'অপবাদে' এক সামিউল আলম রাজন (১৩) নামের শিশুকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় তোলপাড়। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে নির্যাতনের সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করেন নির্যাতনকারীদেরই একজন, যা ওই ভিডিওর কথোপকথনে স্পষ্ট। এ ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গেফতার করেছে। নিহত রাজন সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামের মাইক্রোবাস চালক শেখ আজিজুর রহমানের ছেলে। স্থানীয় অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শেনি পর্যন্ত পড়ালেখা করা রাজন সবজি বিক্রি করত। কুমারগাঁও এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে ভ্যান চুরির অভিযোগে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর একটি মাইক্রোবাসে তুলে রাজনের লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় মুহিত আলম (২২) নামের একজনকে ধরে পুলিশে দেন স্থানীয়রা। সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে ছড়িয়ে পড়া ২৮ মিনিটের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, রাজনকে কুমারগাঁও বাসস্টেশনের একটি দোকানঘরের বারান্দার খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে। এতে দুজনের চেহারা দেখা গেলেও কণ্ঠ শোনা গেছে তিন-চারজনের। 'এই ক (বল) তুই চোর, তোর নাম ক... লগে কারা আছিল...' এসব বলতে বলতে রাজনকে পেটাতে দেখা যায় ওই ভিডিওতে। একনাগাড়ে ১৬ মিনিট তাকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এক পর্যায়ে পানি খেতে চাইলে 'ঘাম খা' বলে মাটিতে ফেলে রাখা হয় তাকে। মারধরের সময় রাজনের আর্তচিৎকার এবং নির্যাতনকারীদের অট্টহাসি ও নানা কটূক্তি শোনা যায়। রাজনের নখ, মাথা ও পেটে রোল দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি বাঁ হাত ও ডান পা ধরে মোচড়াতেও দেখা যায়। এক সময় তার হাতের বাঁধন খুলে রশি লাগিয়ে হাঁটিয়ে নিতে দেখা যায় নির্যাতনকারীদের। বলতে শোনা যায়- 'হাড়গোড় তো দেখি সব ঠিক আছে, আরও মারো...।' এরপর খুঁটির সঙ্গে বেঁধে আরেক দফা পেটানো হয় রাজনকে। সে তাকে পুলিশে দিতে অনুরোধ করলে একজনকে বলতে শোনা যায়, 'আমি পুলিশ।' যিনি ওই ভিডিও ধারণ করছিলেন, তাকে নির্দেশ করে একটি কণ্ঠ জানতে চায়- ঠিকমতো ভিডিও হচ্ছে কি-না। ওপাশ থেকে উত্তর আসে- 'ফেইসবুকে ছাড়ি দিছি, অখন সারা দুনিয়ার মানুষ দেখব...।' শেষ দিকে নির্যাতনকারীদের একজন সঙ্গীদের কাছে জানতে চায়- 'কিতা করতাম?' আরেকজনকে তখন বলতে শোনা যায়- 'মামায় যে কইছন, ওই কাম করি ছাড়ি দে!'
খিলক্ষেতে যেভাবে হত্যা করা হয় নাজিমকে : রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকার মস্তুল গামে এপ্রিল মাসে শিশু নাজিমকে নির্মমভাবে হত্যার পর লাশ নদীতৈ ভাসিয়ে দেওয়া হলেও রাজন হত্যার তোলপাড়ের মধ্যেই নাজিম হত্যার ভিডিওচিত্র মেলে ফেইসবুকে। চুরির অপবাদে নাজিমউদ্দিন নামে ১৪ ওই শিশুটিকে পিটিয়ে হত্যার পর হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় পানিতে। শিশুটি নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে খুনিরা। চাঞ্চল্যকর ওই মামলাটি বর্তমানে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ তদন্ত করছে।
নিহত শিশু নাজিমউদ্দিনের বাবা সালাম মিয়া বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় থাকেন। চলতি বছরের ১২ এপ্রিল এক বন্ধুর সঙ্গে বাইরে যাওয়ার পর আর ছেলের খোঁজ পাচ্ছিলেন না তিনি। পরে ১৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নদীতে নাজিমউদ্দিনের লাশ পাওয়া যায়। খিলক্ষেত থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল কথিত কবুতর চুরির অপরাধে নাজিমউদ্দিনেক আটক করে অমানুষিক নির্যাতন চালায় খিলক্ষেতের মস্তুল গ্রামের ৮ থেকে ১০ জন যুবক। এরপর হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় বালু নদীতে। তিনদিন পর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নাজিমউদ্দিনের লাশ ভেসে ওঠে। ১৮ এপ্রিল সাতজনের নাম উল্লেখ করে তার বাবা খিলক্ষেত থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে পুলিশ ওই ঘটনায় এজাহারনামীয় প্রধান আসামিসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে। ওই সময় তারা মোবাইলে ধারণকৃত হত্যার ছবি উদ্ধার করে। তবে নিহত শিশুটির বাবা জানান, তার ছেলে ষড়যন্ত্রের শিকার। সে চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে না। ফেসবুকে আপলোড করা ছবিতে দেখা গেছে, নির্যাতনের এক পর্যায়ে শিশুটি যখন মৃতপ্রায় তখন সে পানি খেতে চায়। এরই এক পর্যায়ে শিশুটিকে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয় নদীর পানিতে। হাত-পা বাঁধা শিশুটি নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে খুনীরা।
ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ : এদিকে মধ্যযুগীয় নির্যাতনে নিহত শিশু রাকিব হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে খুলনাবাসী। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত নগরীর ব্যস্ততম খানজাহান আলী রোড ও সেন্ট্রাল রোডে দফায় দফায় বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ খুলনাবাসী। এ সময় এ দুই সড়কে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। রাকিব হত্যায় অভিযুক্ত নগরীর টুটপাড়ার শরীফ মোটরসাইকেল গ্যারেজের মালিক শরীফ ও তার সহযোগী মিন্টুর ফাঁসি দাবি করা হয় মিছিল ও বিক্ষোভ থেকে। বিক্ষোভ মিছিলে শিশু রাকিবের একমাত্র বোন রিমি (৮) ও খালা পারুল বেগমসহ সর্বস্তরের নারী, পুরুষ ও শিশুরা অংশ নেয়। সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিবাস চন্দ্র মাঝি নির্যাতনে নিহত রাকিবের বাড়িতে এসে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিয়ে বলেন, এ ঘটনায় ৩ সদস্যের একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
